যুদ্ধবিরতি হলে গাজায় ত্রাণ নিয়ে ঢুকবে একটার পর একটা ট্রাক।

প্রবল আর্ন্তজাতিক এবং অভ্যন্তরীন চাপের মুখে ইজরায়েল বাধ্য হচ্ছে চারদিনের যুদ্ধবিরতিতে যেতে। যে দু'টি মূল লক্ষ্য নিয়ে ইজরায়েল গাজায় স্থল অভিযান শুরু করেছিল, তার একটিও সফল হয়নি৷ প্রথমত, ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের ধ্বংস করা দূরের কথা, তাদের রকেট আক্রমণ বন্ধ করতেও পারেনি ইজরায়েল। দ্বিতীয়ত, এক মাসেরও বেশি সময় ধরে স্থল অভিযান চালিয়ে তারা মাত্র একজন যুদ্ধবন্দিকে উদ্ধার করতে পেরেছে।
movement for free Palestine

ইজরায়েল গত দেড় মাসে যা করতে পেরেছে, তা হল নৃশংস গণহত্যার মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করা এবং উত্তর গাজার একটি বড় অংশের দখল নেওয়া। যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে ইজরায়েলে একের পর বিক্ষোভ হয়েছে। নেতানিয়াহুর পদত্যাগের দাবি উঠেছে। ইজরায়েলের রাজধানীতে প্রতিদিন যুদ্ধবন্দিদের পরিজনরা মিছিল করছেন। মাকি, হাদাস-সহ ইজরায়েলের জায়নবাদ বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলি অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধের দাবি তুলেছে। চলমান সংঘর্ষের জন্য তাঁরা নেতানিয়াহুর অতিদক্ষিণপন্থী সরকারের আগ্রাসী পদক্ষেপকে দায়ি করেছেন।
যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসাবে ৫০ জন ইজরায়েলি যুদ্ধবন্দিকে মুক্তি দেবেন ফিলিস্তিনের সশস্ত্র যোদ্ধারা। অন্যদিকে ইজরায়েলের জেল থেকে মুক্তি পাবেন ১৫০ জন ফিলিস্তিনি বন্দি। যুদ্ধবিরতির সময়কালে গোটা গাজায় ইজরায়েলের সামরিক অ্যাকশন বন্ধ থাকবে। দক্ষিণ গাজায় ড্রোন নজরদারি বন্ধ রাখবে ইজরায়েল, উত্তর গাজায় দিনে সর্বোচ্চ ৬ ঘণ্টা নজরদারি করতে পারবে। এই সময়কালে ইজরায়েল কাউকে গ্রেফতার করতে পারবে না। গাজায় বিপুল পরিমাণ ত্রাণ ঢুকবে। তবে উত্তর গাজা থেকে যারা ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন, তাঁরা সম্ভবত ফিরতে পারবেন না৷ এই শেষ বিষয়টা জায়নবাদীদের একমাত্র বড় সাফল্য, কারণ এর মাধ্যমে তার অবৈধ দখলদারি আরও খানিকটা বাড়বে।
মনে রাখা দরকার, গাজায় হামাস একা জায়নবাদী দখলদারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করছে না। বামপন্থী গেরিলা পিএফএলপি, ইসলামিস্ট পিআইজে, সেকুলার আল আকসা মার্টিয়ার্স ব্রিগেড-সহ একাধিক শক্তি প্রতিরোধের ময়দানে আছে। যুদ্ধবিরতি নিয়ে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ যোদ্ধারা একমত না-ও হতে পারেন। এখনও এর সবটা স্পষ্ট নয়। এমনও হতে পারে প্রতিরোধ যুদ্ধে শামিল বিভিন্ন গোষ্ঠী নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়ার ভিত্তিতেই পরস্পরবিরোধী অবস্থান নেবে, যাতে কূটনৈতিক লড়াইটা ইজরায়েলের পক্ষে কঠিন হয়ে ওঠে।
এখনও অফিসিয়ালি যুদ্ধবিরতির ঘোষণা হয়নি৷ খুব বড় কিছু পরিবর্তন না হলে হয়তো খুব দ্রুতই ঘোষণা হবে। কাতার জানিয়েছে, প্রথমে চারদিনের জন্য যুদ্ধবিরতি হলেও পরে এর মেয়াদ বাড়তে পারে। ইজরায়েল বলেছে, ১০ জন যুদ্ধবন্দির মুক্তির বিনিময়ে তারা একদিন করে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াবে।
এই যুদ্ধে কিছু আশ্চর্য ঘটনা ঘটছে মধ্যপ্রাচ্যে। সংঘর্ষটাকে পশ্চিমের মিডিয়া যেভাবে মুসলিম বনাম ইহুদি বলে চালাতে চাইছে, বিষয়টি আদপেই তেমন নয়। গোটা পৃথিবীতে জায়নবাদ বিরোধী ইহুদিরা রাস্তায় নেমে এসেছেন তো বটেই। সে কথা বাদই দিলাম। সম্প্রতি লেবাননের খ্রিস্টান অভিনেতা রুডনি এল হাদ্দাদ সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লার কাছে আবেদন জানিয়েছেন, তারা যেমন মা ফতিমার নামে ইজরায়েলের দিকে মিসাইল আক্রমণ করে, তেমনই ভার্জিন মেরির নাম নিয়েও করুক। তাহলে তাঁর মতো আরব খ্রিস্টানরাও এই প্রতিরোধ যুদ্ধের সঙ্গে একাত্মবোধ করতে পারবেন৷ হিজবুল্লা এই আবেদনে সাড়া দিয়ে ভার্জিন মেরি বা মারিয়ম আল মুকাদ্দাসার নামে মিসাইল ছুঁড়েছে। মনে পড়ছিল ফিলিস্তিনের মার্কসবাদী গেরিলা বাহিনী পিএফএলপি-র প্রতিষ্ঠাতা জর্জ হাবাসের কথা, যিনি ছিলেন একজন আরব খ্রিস্টান। মনে পড়ছিল এই লেবাননের মাটিতে দাঁড়িয়ে ইজরায়েলের দিকে পাথর ছুঁড়েছিলেন আরও এক আরব খ্রিস্টান এডোয়ার্ড সাঈদ। মনে পড়ছিল একাধিকবার নোয়ান চমস্কি দেখা করেছেন হিজবুল্লার নেতৃত্বের সঙ্গে। মতাদর্শের ফারাক, ধর্মের ফারাক ছাপিয়ে গোটা মধ্যপ্রাচ্যের সাম্রাজ্যবাদ, জায়নবাদ বিরোধী শক্তি ঐক্যবদ্ধ।
যুদ্ধবিরতি সম্ভবত হচ্ছেই৷ এটাই সবচেয়ে আনন্দের কথা। যুদ্ধবিরতি হলে গাজায় ত্রাণ নিয়ে ঢুকবে একটার পর একটা ট্রাক। আপাতত এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি কিছু নেই।

Post a Comment

ধন্যবাদ

أحدث أقدم