ছোট গল্পঃ নেশা

নেশা
জিয়ারুল হক

ট্রেনটা নয় নম্বর প্লাটফর্মে ঢুকতেই হুটোপুটি লেগে গেল। যে যার সিট দখল করে বসার পর, যারা জায়গা পেলো তারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। যারা পেলোনা তারা কেউ নিজেদের কপালের, স্বামীরা তাদের স্ত্রীদের দোকানে ঢুকে এটা সেটা পছন্দ করতে, দাম দর কসার জন্য তিরস্কার করতে থাকলো, আমাকে সাক্ষী করে একজন বলেই ফেললো–দাদা ভুলেও মেয়েদের নিয়ে কোনো জিনিস কিনতে যাবেন না, গিয়েছেন তো ফেঁসেচেন, এদের সময়ের জ্ঞান নেই। আমিও অগত্যা সম্মতি সূচক মাথা নাড়লাম। আমি চুপ করে বসে আছি। কদিন পর এবার মনে হচ্ছে গরমটা পড়লো। পাশের সিটে আলুথালু লম্বা চুল ওয়ালা যুবক জানলায় হেলান দিয়ে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। কষা বেয়ে গুটখার পিক চুঁইয়ে পড়েছে, ভ্রূক্ষেপ নেই। ট্রেনে জানলার ধারের সিটের লোভ আর পাঁচজনের মতই আমারও। বরংএকটু বেশি। সবুজ প্রকৃতির মাঝ দিয়ে যখন ট্রেন চলে কি ভালোই লাগে! মনে হয় এই প্রকৃতি কত সুন্দর! হাজার দুঃখের মাঝেও কিছুটা মন ভালো করে দেয়।

আমি শুধালাম –এই যে শুনছ, কোথায় যাবে? ঘুম জড়ানো কন্ঠে বলে উঠলো–লালগোলা। জানলার সিটটা কি আপনার দরকার?
–না, মানে তুমি তো বসেই আছো আর তাছাড়া যাবেও তো শেষ প্রান্তে।
–ঠিক আছে বসুন। কিছু মনে করবেন না। আমি একটু নেশা করি। কেউ এলে মুখে মদের গন্ধ পেলে আমাকে হয়তো নামিয়ে দেবে, চাইলে পুলিশেও দিতে পারে। আমি বললাম ঠিক আছে, আমার জানলা লাগবে না, তুমি বসো।
– না না বলছি তো আপনি বসুন। এত কিছু সত্ত্বেও সে জোর করে আমাকে বসিয়ে দিল।
রানাঘাট স্টেশনে ট্রেন ঢুকলো। আমার পাশে সবুজ পাজামা পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি পরা আর মুখভর্তি মেহেন্দি করা দাড়িওয়ালা মৌলবী উঠলেন। ট্রেনে সেই মাতাল যুবকটার পাশের সিট খালি হয়েছিল,সেখানেই বসলেন।বসার সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে আতরের শিশি থেকে খানিকটা নিয়ে রুমালে মাখিয়ে একটা বিরক্ত সূচক মুখভঙ্গিমায় যুবকের দিকে বাঁকা ভাবে তাকালেন। যুবকটি ও ঢুলুঢুলু বাঁকা নজরে লক্ষ্য করে আবার চোখ বুঝে রইলো।
ট্রেনে চা, ঝালমুড়ির, আঙ্গুর আর রকমারী পসরার হকারদের চিৎকারে কান ঝিঁঝিঁ করছে।
–দাদা দুটো চা দেবে। হাকারটিকে বললো যুবকটি।
–পাঁচটাকার না দশ টাকার কাপ?
–দশ টাকার ।
হকার চা বানিয়ে প্রথম কাপটি যুবকের হাতে তুলে দিয়ে দ্বিতীয় কাপ কার জন্য জানতে চাইল।
যুবক আমার দিকে ইশারা করে বলল–চা খান।
- আমি বললাম না না আমি এই অসময়ে চা খাইনে।
– আরে ধরুন তো। এক প্রকার জোর করেই চায়ের কাপ টি হাতে ধরিয়ে দিল। মন কেমন কেমন করা সত্ত্বেও চা খেলাম।

ট্রেন কৃষ্ণনগরে পৌছালো। সামনের সিটের সবাই নেমে গেলো। গেরুয়া বসন, মাথায় গেরুয়া পট্টি, কপালে তিলক পরা একজন উঠে সামনে বসলেন। আমার বেশ রোমাঞ্চ লাগছে। একদিকে মৌলবী আর একদিকে সন্ন্যাসী। মৌলবী এতক্ষন ধরে তার দামি স্ক্রিনটাচ মোবাইলে ইউটিউবে কিভাবে দিল্লিতে হিন্দুরা মুসলিমদের হত্যা করেছে, কিভাবে মসজিদের মিনার ভেঙে দিয়েছে সব দেখছে।

সন্নাসীও তার ঝোলা থেকে মোবাইল ফোন বের করে কিভাবে মুসলিমরা ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে হিন্দুদের বিরুদ্ধে তার গরম গরম খবর দেখতে শুরু করলো। যুবকটি আমাকে তার জায়গাটি দেখতে দিয়ে বাথরুমে যাবার জন্য উঠে দাঁড়াতেই খানিকটা টাল খেয়ে সন্ন্যাসীর গায়ে পড়ে গেল। সন্ন্যাসীর হাতের মোবাইল পড়ে গেল মেঝেতে।কানে লাগানো হেড ফোনটি পৈতের মত ঝুলছে সান্নাসীর গায়ে। যাত্রীরা সমস্বরে রে রে করে তেড়ে এলো–শালা মাতাল তুমি ট্রেনে উঠেছ মাল খেয়ে না? পিটিয়ে ছাল তুলে নেবো, ইত্যাদি ইত্যাদি। সন্ন্যাসী মোবাইলটা তুলে ছেলেটির দিকে গরগর করে তাকিয়ে তার গাম্ভীর্য বজায় রাখলো। মৌলবী এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন। তিনি সন্ন্যাসিকে বললেন–বুঝলেন, এরা উপর ওয়ালাকে ভয় করেনা, নেশা ভান করছে, জানেনা এদের ঠাঁয় হবে জাহান্নামে।

সন্ন্যাসী বললেন–ঘোর কলি, ঘোর কলি! এরপর দুজনের দোজখ– নরক, স্বর্গ –বেহেস্তের গল্প চলতে থাকল।ট্রেনের বাকি যাত্রীরাও যে যার জায়গা দখল করে বসলো। যুবকটি ফিরে এসে যথাস্থানে বসতেই মৌলবী ঘৃণায় উঠে গিয়ে বিপরীত সিটে বসা সন্ন্যাসীর পাশে গিয়ে বসলেন। মৌলবী এবার যুবকটিকে উপদেশ দিতে শুরু করলেন, কেন নেশা করা হারাম, নেশা আসলে শয়তানের চক্রান্ত। সান্নাসীও তার মত করে মাঝে মাঝে অতি বিনয়ের সুরে যুবককে বললেন–হে যুবক ঈশ্বরের পথে ফিরে এসো। তিনিই সব। তাকে প্রার্থনা করো তিনি উদ্ধার করে দেবেন। যুবকটি তাদের কথা শুনছে কি শুনছে না আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারলামনা। কিন্তু একটা বিষয় আমার ভীষণ ভালো লাগছে আমার এই দেশে যে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তার মাঝে এইভাবে দুজন ভিন্নধর্মী মানুষ পাশাপাশি বসে খোশ মেজাজে গল্প করে যাচ্ছে-আমার চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে।এই তো সম্প্রীতি!

ট্রেন কি কারনে বলরামপুর হল্ট এ কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে আছে। বহরমপুরের যাত্রীরা ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিয়ে নামার জন্য প্রস্তুত ।
যুবকটি উঠে দাঁড়িয়ে বললো–ভাই সব আমি মাতাল ছিলাম এতক্ষন। আমি এখন সুস্থ। মাতাল বলে আমার কথাগুলি হয়তো ভালোভাবে নেবেন না, কিন্তু তবু দয়া করে একবার শুনবেন। ট্রেনের সকল যাত্রী চকিতে তার কথা শোনার জন্য উন্মুখ হয়ে উঠলো। যুবকটি বললো –আমি দিল্লিতে কাজ করতাম, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজও পড়তাম। আমার কাজ নেই, এখন আমি বেকার। প্রাণে বেঁচে ফিরেছি এটাই আমার মায়ের শান্তনা। বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে নেশা একটু আধটু করি একদিন তা ছেড়ে দেব, কিন্তু আমি উপলব্ধি করেছি ধর্মের চেয়ে মারাত্মক নেশা আর এ জগতে কিছু নেই। ট্রেনের যাত্রীরা যতটা হতবাক তার অধিক হতবাক মৌলবী আর সন্ন্যাসী। তারা একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করে বললেন –যতসব পাগল! মাতালের সব কথার জবাব দিতে নেই!
ট্রেন বহরমপুরে ঢুকলো। আমি কাঁধে ব্যাগটি নিয়ে নেমে জানলার ধারে এসে বললাম -ভাই,তোমাকে ঠিক চিনিনা তবু বলি সাবধানে যেও। আর নেশা করোনা।

নেশা
সংগৃহীত 


যুবকটি বললো ঠিক আছে জিয়া দা, তোমার কথা মনে থাকবে। আমাকে তুমি চিনতে পারোনি, কিন্তু ট্রেনে ওঠার সময়ই তোমাকে চিনতে পেরেছি, আমি রাজারামপুরের ফারুক। দু হাজার আট সালের ছাত্র ভর্তির সমস্যা নিয়ে আন্দোলনের সময় তোমাকে দেখেছি। মনে পড়ছে তোমার? আমার মাতলামির কারনে তুমি বিপদে না পড় তাই ট্রেনে পরিচয় দিইনি। ট্রেন ছেড়ে দিলো.............একে একে কামরাগুলো আমাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। আমি ট্রেনের পিছনে তাকিয়ে রইলাম। একটা বিশাল ক্রস চিন্হ আর টিপ টিপ করে জ্বলা লাল আলোর বাল্বটি ক্রমে একটা বাঁক নিয়ে চোখের আড়ালে চলে গেলো।

Post a Comment

ধন্যবাদ

Previous Post Next Post