Header Ads

Header ADS

যেভাবে গুলশন কুমারের মস্তিষ্ক থেকে T-Series HMV কে হারাল



                                                লিখেছেনঃ আনন্দরূপ রায় 

          ফিল্মে অনেক ফ্যান্টাসি থাকে আবার ফিল্মি দুনিয়ার অনেক মানুষের জীবনেও এত ফ্যান্টাসি থাকে যে খোদ তাদের জীবনের উত্থান পতন নিয়েই একটা পূর্ন দৈর্ঘ্যের ছবি বানিয়ে দেওয়া সম্ভব। এমনই একজন ছিলেন সুপার ক্যাসেট বকলমে টি সিরীজ কোম্পানির মালিক গুলশন কুমার। দরীয়াগঞ্জের এক জুস বিক্রেতা থেকে সমগ্র ভারতের সংগীত জগতের বেতাজ বাদশা হয়ে যাওয়া আবার শেষে আন্ডারোয়ার্ল্ডের ঘাতকদের হাতে জীবন সমাপ্ত হওয়া ক্যাসেট কিং গুলশন কুমারের জীবন কোনো থ্রিলার মুভির চেয়ে কম ঘটনাবহুল নয়।
 
ছবিঃ আন্তর্জাল থেকে
           দিল্লীর এক পাঞ্জাবী ব্যাবসায়ী পরিবারের বড় ছেলে গুলশন পড়াশোনা শেষ করার পরে দরিয়াগঞ্জ শহরে একটি ফ্রুট জুসের বড় দোকান খোলেন। ব্যাবসা ভালই চলছিলো। গুলশনের কিশোর বয়স থেকেই গান গাইবার শখ ছিলো। আর শখ ছিলো নিজের গলার গান রেকর্ডিং করে সকলকে শোনানোর। গান বিষয়টার প্রতি ছেলের আগ্রহ দেখে গুলশনের বাবা তার জন্যে একটা ক্যাসেট বিক্রি এবং সারাইয়ের দোকান খুলে দেন। ঠিক এই জায়গাটাই ছিলো গুলশন কুমারের স্বপ্নের উড়ানের প্রথম ধাপ। তুখোড় ব্যাবসায়িক বুদ্ধি সম্পন্ন গুলশন ক্যাসেট বিক্রি করার পাশাপাশি ক্যাসেট নিয়েই আরেকটা কারবার ফেঁদে বসেন সেটা হলো স্থানীয় ছোটো ছোটো স্বল্পখ্যাত গায়কদের দিয়ে স্থানীয় উৎসব কেন্দ্রিক আর ভক্তিগীতি রেকর্ডিং করিয়ে নিজের দোকান থেকে অল্পদামে বিক্রি করা। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই কারবার থেকে গুলশনের হাতে একটা ভালো রকম ক্যাপিটাল জমা হয়ে যায়। যেটা দিয়ে দিল্লীর কাছে নয়ডায় একটা ছোটো রেকর্ডিং স্টুডিও বানান গুলশন। টি সীরিজ নামক মহীরুহের সেটাই ছিলো অঙ্কুর। এখানেই না থেমে গুলশনের মাথায় ঘুরতে থাকে সঙ্গীত জগতকে কেন্দ্র করে ব্যবসা করার নিত্য নতুন পরিকল্পনা।
    
            সেই সময়ে ভারতের ক্যাসেটের বাজারের প্রায় পঁচাশিভাগ দখল করে রেখেছিলো HIS MASTER VOICE ( HMV ) কোম্পানী। প্রায় স্বাধীনতার সময়কাল থেকে আশীর দশকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত যাবতীয় হিন্দী ফিল্মের গানের কপি রাইটের প্রায় নব্বইভাগই ছিলো HMV র কব্জায়। সংগীত জগতে Monopoly ছিলো HMV র। ফলে তারা ক্যাসেটের দামও চাপিয়ে রেখেছিলো নিজেদের ইচ্ছে মতো। সেই সময়ে তিরিশ টাকা বা পঁয়ত্রিশ টাকা দিয়ে ক্যাসেট কিনে গান শোনার ক্ষমতা সমাজের একটা নির্দিষ্ট অংশেরই ছিলো। অল্প রোজগেরে মানুষের ইচ্ছে থাকলেও নিজের পছন্দের গায়ক গায়িকাদের গান শোনার জন্যে রেডিওতে বিনাকা গীতমালা আর টিভিতে চিত্রহার ছাড়া আর কোনো গতি ছিলো না। গুলশন কুমার ঠিক এই জায়গাটা ধরেই একটা দুর্দান্ত কাজ করলেন।
গুলশন খুব খূঁটিয়ে ভারতের কপি রাইট সংক্রান্ত আইনটা পড়েছিলেন। পড়ে তিনি একটা বিষয় নিশ্চিত হয়ে যান যে স্বত্বাধিকারীর মূল স্বত্বে হাত দেওয়াটা বা সেটাই তুলে নিয়ে ব্যাবসা করাটা আইনতঃ অপরাধ কিন্তু তার ডুপ্লিকেট বা নকল করাটা কোনো অপরাধের পর্যায়ে পড়ে না। ব্যাস! উঠে পড়ে লেগে গেলেন গুলশন কুমার।
           গায়ক হওয়ার স্বপ্ন আছে, গলাও দারুন কিন্তু প্রথম সারির গায়কদের সাথে পাল্লা দেওয়ার মতো উপযুক্ত প্ল্যাটফর্ম পাচ্ছে না এমন কিছু স্ট্রাগলার গায়ক গায়িকা এবং সঙ্গীতকারদেরকে আমন্ত্রন করে তাদের দিয়ে মুকেশ, রফি, কিশোর, লতা, আশাদের সুপারহিট সব গান গাইয়ে নিজের কোম্পানী থেকে মার্কেটে ছাড়লেন গুলশন। যাদের কে সেইসময়ে গুলশন প্ল্যাটফর্ম প্রোভাইড করেছিলেন সেই কুমার শানু, উদিত নারায়ন, নীতিন মুকেশ, সোনু নিগম, বিপিন সচদেভ, বাবলা মেহেতা, অনুরাধা পোড়োয়াল, বেলা ভাটনাগর এঁনারা প্রত্যেকেই পরবর্তীকালে নিজেদের নিজস্বতা দিয়ে এক একজন দিকপাল শিল্পীতে পরিনত হয়েছিলেন। গুলশন কুমার ছিলেন বলেই কিশোর কুমারের মৃত্যুর পরে কুমার শানু সেই শূন্যস্থানটা অনেকটাই ভরাট করে দিতে পেরেছিলেন।
          
          আশীর দশকের ঠিক মাঝামাঝি অডিও ক্যাসেট বিক্রির বাজার তুঙ্গে ওঠে। টি সিরীজ কোম্পানী থেকে মুকেশ কি ইঁয়াদে, রফি কি ইঁয়াদে, কিশোর কি ইঁয়াদে, লতা কি ইঁয়াদে , সুপারহিট ডুয়েটস ইত্যাদি নাম দিয়ে হিন্দী সিনেমার সুপার ডুপারহিট গানগুলির ক্যাসেট বের হয়। ক্যাসেটের মূল কভারে বড় করে মুকেশ, রফি, কিশোর, লতা এনাদেরই ছবি জ্বলজ্বল করতো আর পেছনের দিকে সিগারেট খাওয়ার বিষয়ে সতর্কীকরনের মতো ছোট্ট করে আসল গায়কের নামটা লেখা থাকতো। কেমন করে জানি বাইরে থেকে খুব সস্তায় সেলুলয়েড টেপ আর ক্যাসেট তৈরীর বাকি সরঞ্জাম আমদানীর ব্যবস্থা করেছিলেন গুলশন কুমার। কিন্তু রেকর্ডিং সিস্টেম ছিলো সেইসময়ের ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ডের। HMV র ওয়ান থার্ড প্রাইসে T series মার্কেটে ক্যাসেট ছাড়া শুরু করে। অচিরেই এই ইঁয়াদে সীরিজের ভলিয়্যুমগুলি শ্রোতাদের মন জয় করে নেয়। বিপুল চাহিদা বেড়ে যায়। যে গান HMV র ক্যাসেট কিনে শুনলে তিরিশ টাকা খরচ করতে হতো সেই গান T series এর ক্যাসেটে মাত্র বারো টাকায় দর্শক পেয়ে যায়। ওরিজিন্যাল সাউন্ডট্র্যাকের চেয়েও ডুপ্লিকেটের ডিমান্ড আকাশ ছোঁয়া হয়ে যায়। গুলশন কুমারের ধনভান্ডার উপচে পড়তে থাকে। সেই পুঁজি এবার গুলশন সরাসরি বিনিয়োগ করেন হিন্দী গানের স্বত্ব কেনার ব্যাবসায়।
          হিন্দী ফিল্ম প্রোডিউস করাতেও হাত লাগান। লাল দুপট্টা মলমল কা, জীনা তেরী গলি মেঁ, মীরা কা মোহন, বাহার আনে তক, আয়ি মিলন কি রাত প্রভৃতি সিনেমার গান ভীষন জনপ্রিয় হয়। 1990 এ গুলশন প্রযোজিত আশিকী ক্যাসেট বিক্রির সব রেকর্ড ভেঙ্গে দেয়। অনুরাধা পড়োয়ালকে ব্যাক আপ দিয়ে গুলশন কুমারই প্রথম গানের জগতে লতা আশার একচেটিয়া আধিপত্যে ভাঙ্গন ধরান। 1985 - 1995 দশ বছর ক্যাসেট সেলিং এবং গানের কপি রাইট কিনবার বিষয়ে টি সিরীজের ধারে কাছে কেউ ছিলো না। ক্যাসেট বিক্রির বাজারের 65% শতাংশ দখল করে নেয় গুলশন কুমারের সুপার ক্যাসেট কোম্পানী। বাৎসরিক টার্নওভার সাড়ে তিনশো কোটি টাকায় দাঁড়িয়ে যায়। ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদী এই ব্যবস্থায়, কোরাপ্টেড কর্পোরেট জমানায় গুলশনের এই গগনচুম্বী সাফল্যই তাঁর জীবনে কাল হয়ে দাঁড়ায়।
          টি সিরীজের একচেটিয়া বাজার দখল HMV, Polygram, Venus, Tips এর মতো ক্যাসেট কোম্পানীগুলোর মাথাব্যাথার কারন হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। গুলশন কুমারের প্রচুর উঠতি সংগীত পরিচালক কে এস্টাব্লিশ করে দিয়েছিলেন যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল নাদীম শ্রাবন এবং আনন্দ মিলিন্দ জুটি। এই নাদীম শ্রাবন জুটির একজন নাদীম একটি গানের এলবাম করেছিলেন হায় জীন্দেগী নাম দিয়ে যার প্রমোটিং এর দায়িত্বে ছিল গুলশনের টি সিরীজ। নাদিমের মনে হয়েছিল তার এই এলবামকে গুলশন ঠিকমতো প্রমোট করছেন না। এই নিয়ে গুলশনের সাথে নাদীমের মনোমালিন্য হয়। তার জেরে সুপার ক্যাসেটের সাম্রাজ্য থেকে নাদীমকে বহিষ্কার করে দেন গুলশন এবং জানিয়ে দেন নাদীম সুরকারের দায়িত্বে আছেন এমন কোন সিনেমার মিউজিক রাইট টি সিরীজ কিনবে না। যেহেতু সেই সময়ে ভারতীয় সঙ্গীত বিপননের একটা বিশাল মার্কেট টি সিরীজের কব্জায় ছিল ফলে গুলশনের এহেন সিদ্ধান্তে নাদীম বেশ ভালোমতো বেকায়দায় পড়ে যান। নাদীমের ক্যারিয়ারের ওপরে প্রশ্নচিহ্ন ঝুলে যায়। নাদীম আক্রোশের বশে গুলশনকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্যে আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন দাউদ ইব্রাহীমের ডানহাত আবু সালেমের শরনাপন্ন হন। 
       বলিউডে টিকে থাকতে গেলে অন্ধকার জগতের সাথে একটা অলিখিত সমঝোতা করে চলতে হয়। নজরানা দিতে হয়। গুলশনের কাছেও টাকা চেয়ে মাফিয়ারা হুমকি দিয়েছিলো। গুলশন তাদের চাহিদার পরিমানের টাকার প্রথম কিস্তী দিয়ে আর দেননি এবং তাদের ক্রমাগত থ্রেটের ওপরেও কোনো কর্নপাত করেননি। অন্ধকার জগত এই জায়গাটাতে গুলশনের ওপরে আগে থেকেই ক্ষিপ্ত হয়েছিলো। কারন যে ভয় কে পুঁজি করে তাদের ব্যাবসা, মানুষ যদি সেই ভয়টাই না পায় তাহলে মাফিয়া জগতের কাছে সেটা চিন্তার কারন হবেই। আবু সালেম ফোন করে গুলশনের কাছে জানতে চায় গুলশন কেন নাদীমকে প্রমোট করছেন না? গুলশন এর ঠিকমতো জবাব দেননি। এরপরেই আবু সালেমের গ্যাং থেকে ফোন করে গুলশন কুমারের কাছে দশ কোটি টাকা দাবী করা হয়। গুলশন তার জবাবে কিছু কড়া কথা সালেমকে শুনিয়ে দেন যেটা আগুনে ঘিয়ের কাজ করে। আবু সালেমের গোপোন ডেরায় গুলশনকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার ব্লু প্রিন্ট তৈরী হয়। দুর্জনেরা বলে সেই বৈঠকে নাকি স্বয়ং নাদীম এবং টিপ্সের মালিক থুরানীও উপস্থিত ছিলেন। সেখানেই স্থির হয় গুলশনকে প্রানে মেরে ফেলেই বলিউডের বাকিদের কাছে একটা মেসেজ পাঠানো যাবে যে আন্ডারোয়ার্ল্ডের কথা অমান্য করলে তার কি পরিনাম হয়!
       1997 সালে 12 ই আগস্ট বোম্বের কাছেই জীতেশ্বর শিবমন্দির সংলগ্ন এলাকায় এক সুপারী কীলার গুলশন কুমারের শরীর ১৬ টা গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেয়। এরপরে নিজের ফোন অন করে প্রায় পাঁচ মিনিট গুলশন কুমারের মরন আর্তনাদ আবু সালেমকে শুনিয়েছিল সুপারী কিলার রাজা। পুলিশ তদন্তে নামে। নাদীম ইংল্যান্ডে পালিয়ে যান। ভারত সরকার এই হত্যাকান্ডে নাদীমের জড়িত থাকার বিষয়ে যথেষ্ঠ তথ্য প্রমান না দিতে পারায় ইংল্যান্ড গভর্মেন্ট নাদীমকে ভারতের হাতে প্রত্যর্পন করেনি। নাদীম আজও ইংল্যান্ডেই রয়েছেন। টিপ্সের মালিক থুরানী গ্রেফতার হয়েছিলেন। আর সুপারী কিলার রাজাকেও পুলিশ এরেস্ট করতে সমর্থ হয়েছিলো। কিন্তু এরপরে আর তদন্তে বিশেষ কিছু অগ্রগতি হয়নি। যেদিন সকালে গুলশন কুমার খুন হন সেইদিনই রাত্রের মধ্যে বলিউড ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির বিভিন্ন জায়গা থেকে আন্ডারওয়ার্ল্ডএর ঘরে পঞ্চাশ কোটি টাকার নজরানা জমা পড়ে।
     গুলশন কুমার বহু উঠতি শিল্পীকে সুযোগ দিয়েছিলেন। তার কোম্পানী টি সিরীজ শুধু ক্যাসেট নয় ইলেক্ট্রিক্যাল এবং ইলেক্ট্রনিক্স সামগ্রী থেকে শুরু করে ওয়াশিং পাউড়ার পর্যন্ত তৈরী করা শুরু করেছিলো। গুলশন কুমারের সবচেয়ে ভুল ছিলো গায়িকা অনুরাধা পড়োয়ালকে নায়িকা আর নিজের ভাই কিষন কুমারকে বলিউডের নায়ক বানানোর চেষ্টা করা। এই কিষন কুমারের নাম 2000 সালে ক্রোনিয়ে গেট ঘটনার সময়ে ক্রিকেট ম্যাচ ফিক্সিংএও জড়িয়ে যায়। এই মুহুর্তে গুলশন কুমারের পুত্র ভূষন কুমার টি সিরীজের ব্যাবসা দেখাশোনা করেন।

No comments

Powered by Blogger.